সুস্থ থাকার জন্যে ডঃ লাজপতরায় মেহেরার কিছু পরামর্শ | স্নান করবার নিয়ম :-

● সম্ভব হলে সারা বছর ঠাণ্ডা জলে স্নান কড়া উচিত। মাথা ধোওয়ার সময় প্রথমে এক মগ জল মাথায় ঢালতে হবে, কিন্তু নজর রাখতে হবে জল যেন কানে না যায়। তারপর ঘাড়ের নীচে পিঠ এবং কাঁধে, এরপর সারা শরীরে ঢালতে হবে।

কারণ – মাথায় জল ঢালবার সময় যদি জল প্রথমে কাঁধ বাঁ কানে পড়ে তাহলে একটা দীর্ঘশ্বাস এসে যাওয়ার ফলে কানে জল ঢুকে যেতে পারে। এই জল কানের wax কে পাতলা করে দেওয়ার পরে কানের ভিতরের গরমের কারনে একটা bubble এর মতো তৈরি হয়, যার প্রেশার কানের ছিদ্রতে এসে যাওয়ার কারনে শুনতে পাওয়ার শক্তি কমে যায়। যারা কম শোনেন, তারা যদি আমাদের ট্রিটমেন্ট নেওয়ার সাথে সাথে স্নান করার পদ্ধতি সঠিক করেন তাহলে তাদের খুব তাড়াতাড়ি উপকার হয় – এটা একটা আশ্চর্যের বিষয়। যাদের ঠাণ্ডা জলে স্নান করার অভ্যাস থাকে তাদের রক্ত সঞ্চার ভালো হবার কারণে সর্দি-কাশি কম হবার সম্ভাবনা থাকে।

● কিছু লোকের অভ্যাস আছে যে বসে গরম জলে স্নান করার সময় সবথেকে প্রথমে তিনি হাঁটুতে জল ঢালেন। গুরুজী বলে থাকেন, বৃদ্ধ বয়সে হাঁটুতে ব্যাথা আসার এটা একটা অন্যতম কারণ। তাই প্রথমে হাঁটুতে জল না ঢেলে উপরে বলে দেওয়া অনুযায়ী মাথায় জল ঢেলে স্নান শুরু কড়া উচিত।

● আমাদের সাবান মেখে স্নান কড়া উচিত নয় কারণ এর থেকে আমাদের চামড়া ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ঘাম নিজেই উপকারি কারণ এর মধ্যে অনেক কীটানুনাশক তত্ত্ব আছে, যা সাবান লাগানোর পরে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। স্নান করার আগে সরসের তেল বা অন্য কোন তেল এই পাঁচটি জায়গাতে লাগানো উচিত – কানের পিছনে, নাকে, নাভীতে,  , এবং armpit অর্থাৎ কাঁধের মধ্যে। এইসব জায়গাতে লাগানোর পরে (সাবান ছাড়া) শুধু জলে স্নান কড়া উচিত। গুরুজী নিজেই এর প্রমাণ, কারণ এইরকম করলে শরীরে কোনপ্রকার দুর্গন্ধ বা চর্মরোগ হয় না কারণ বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে গুরুজী সাবান ছাড়াই স্নান করে আসছেন। যতটা সম্ভব ঠাণ্ডা জলে স্নান করলে শরীরে রক্ত সঞ্চারের জন্যে উপকারি। যদি ছোটো বয়সেই এই অভ্যাস করানো যায় তাহলে বাচ্চাদের সর্দি-কাশি ইত্যাদি সমস্যা হবে না।

● যেরকমভাবে উপরে বলা আছে, বাচ্চাদের স্নান করানোর সময় জল কানের বদলে প্রথমে মাথায় ঢালতে হবে, তারপর কাঁধে, এরপর সারা শরীরে ঢালতে হবে।

খাওয়ার নিয়ম –

● সকালে ঠাণ্ডা জলে স্নান করার পরে, অন্তত ৪৫ মিনিট পরে জলখাবার খাওয়া উচিত।

কারণ – স্নান করার পর শরীর গরম হতে আধ ঘণ্টা থেকে ৪৫ মিনিট পর্যন্ত সময় লাগে। তখন রক্তসঞ্চার ত্বকের উপর বেশী থাকে অন্য অঙ্গের তুলনায়। পেট এবং digestive system তখনই ঠিক করে কাজ করবে, যখন পর্যন্ত না সারা শরীর গরম হবে এবং রক্তসঞ্চার তাদের দিকে না হবে। আর ওই সময় জলখাবার খেলে সেটা কম হজম হবে এবং গ্যাসের সমস্যা হবে। মনে রাখতে হবে যে স্নান করার পরেই জলখাবার খাওয়া উচিত। যদি কোনো সময় জলখাবার আগে খেতে হয়, তাহলে তার অনেকক্ষণ পরেই স্নান করা উচিত যতক্ষণ পর্যন্ত না খাবারটি হজম হচ্ছে। যদি জলখাবার বা অন্য কোনো খাবার খাওয়ার কিছুক্ষন পরেই কেউ স্নান করেন, তাহলে indigestion বাঁ পেটের অন্য কোনো সমস্যা হতে পারে।  

● আমরা যা কিছুই খাই না কেন, সেটা সর্বদা পা মুড়ে বসেই খেতে হবে যাতে রক্তের প্রভাব পেটের উপর অধিক হয়। এটা এই জন্যে হয় যে প্রকৃতির অনুসারে খাওয়ার পরে পেট এবং digestive system এর সাথে সম্বন্ধিত অঙ্গগুলিতে বেশীমাত্রায় রক্তের প্রভাব থাকে, কারণ তখন ওই অঙ্গগুলিতে বেশী পরিমাণে রক্তের দরকার পরে। যদি চেয়ারে বসে খাওয়া হয় তাহলে খাওয়ার সময় পা নিচের দিকে থাকবে, আর তাই পৃথিবীর আকর্ষণ শক্তি অনুযায়ী রক্তের প্রভাব পায়ের দিকে বেশী থাকবে এবং তার ফলে digestive system সঠিকভাবে রক্ত পাবে না।

● এইভাবে খাবার পরেই হাঁটাচলা করা বা অন্য কোনো কাজ করা হলে digestive system এর থেকে হাত পায়ের বেশী রক্তের প্রয়োজন হবে, যাকে ঠিক করতে হলে heart কে বেশী কাজ করতে হবে, আর এর থেকে শরীরের বেশি সমস্যা হবে। এটাই কারণ যে প্রত্যেক মানুষের খাওয়ার পর অন্তত ২০ মিনিট হাঁটাচলা করা উচিত নয়। কিন্তু যদি কেউ বজ্রাসনে বসেন তাহলে খুবই উপকার হবে। সাধারণত heart patient দের এবং যাদের হাঁটলে নিঃস্বাসে সমস্যা হয় – তাদের এই কথাগুলো মানা খুব দরকার।

● স্কুল-কলেজের বাচ্চাদের সাধারণত জলখাবার ঠিক পরেই বাস ইত্যাদির জন্যে ছুটতে হয়। যদি ছোটোবেলা থেকেই তাদের training দেওয়া হয় যে বেরোনোর কিছুক্ষন আগেই খেয়ে নিতে হবে এবং কিছু কাজ থাকলে যা বসে করতে হবে সেটা জলখাবারের পরে অভ্যাস করালে এবং কিছুক্ষন বসার পরে স্কুলে গেলে হজমের অসুখ থেকে তারা বাচতে পারবে। অফিস যাওয়ার সময় এই নিয়মগুলো মেনে চলা হলে স্বাস্থ্য তাড়াতাড়ি খারাপ হবে না।

● খাবার খাওয়ার আগে হাত ভালো করে ধুয়ে নিয়ে খাওয়া উচিত। আমদের পূর্বপুরুষরা আচমন করে খাবার থালার চারদিকে জল ঢেলে খাওয়া শুরু করতেন – কারণ কোনো পোকা বা ব্যাকটিরিয়া যাতে খাবারে না চলে আসে, কারণ যদি থালার চারদিকে জল দেওয়া হয় তাহলে তারা আর আসতে পারবে না। এছাড়াও খাবার সময় জল রাখা উচিত যাতে খাবার গলায় আটকে না যায়।

● খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খেতে হবে যাতে বেশীমাত্রায় লালা বেরোয়, যা ভাত এবং অন্য মিষ্টি খাবারকে হজম করতে সাহায্য করে। এছাড়াও চোয়ালের নাড়াচাড়াতে ব্রেনের নার্ভ ঠিক করে কাজ করবে, যার থেকে হজম প্রক্রিয়া সঠিকভাবে হবে এবং খাবার ঠিক করে হজম হবে। যদি খাবার সময় fats ঠিক করে হজম না বাড়ে তাহলে মোটা হবার লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

● খাবার খাওয়ার মাঝখানে বা খাওয়ার ঠিক পরেই জল খাওয়া উচিত নয়। খাওয়ার আধঘণ্টা আগে এবং খাবার আধঘণ্টা পরেই জল খেলে ভালো হবে।

কারণ – পেটে HCL acid তৈরি হয় যা  proteins কে ঠিক করে হজম করানোর জন্যে pepsin নামক enzyme কে সাহায্য করে। এই অ্যাসিড খুবই শক্তিশালী হওয়া উচিত যাতে ওই অ্যাসিডে কোনো bacteria বা virus বেঁচে থাকতে না পারে। খাওয়ার মাঝখানে জল খেলে লালা এবং অ্যাসিড দুটোরই শক্তি কম হয়ে যাওয়ার ফলে হজম প্রক্রিয়া বিগড়ে যাবে। কিন্তু খাবার খাওয়ার সময় জলের গ্লাস সাথে রাখাই উচিত, কারণ কখনও কোনো খাবারের গ্রাস গলাতে আটকে গেলে বা ঢেঁকুর উঠলে জল কাজে লাগবে। যদি খাবারের গ্রাস আটকে যায় বা মুখের ভিতর শুকিয়ে গেলে এক-আধ ঢোক জল পান করা উচিত।

প্রকৃতি মানুষকে সব কিছু দিয়েছে, যার মধ্যে একটা হল জল, যা সহজেই পাওয়া যায়। কিন্তু কিছু মানুষ সারাদিনে জল খুবই কম খায়। খাবার খাওয়ার আধঘণ্টা পরে এক গ্লাস জল খেতে হবে এবং তারপরে প্রত্যেক এক-দেড়ঘণ্টা পর পর এক গ্লাস করে জল খাওয়া উচিত – এইরকমভাবে প্রত্যেকের একদিনে কমপক্ষে দশ বারো গ্লাস জল খাওয়া উচিত অর্থাৎ প্রত্যেকদিন দুই থেকে আড়াই লিটার জল অবশ্যই খাওয়া উচিত।

কারণ – আমাদের শরীরে প্রস্রাব, ঘাম এবং নিঃশ্বাসের মাধ্যমে অনেক জল বেরিয়ে যায়, যাকে balance করা জরুরী। জল কম খাওয়ার কারনে অনেক অসুখ হতে পারে – যেমন constipation, rheumatism, low bp, acidity ইত্যাদি, যাদের আমরা acid এর অসুখ বলে থাকি। একবার অসুখ হয়ে যাওয়ার পর বেশী জল খেলেও কম উপকার দেখা যায়। চা, ঠাণ্ডা পানীয়  ইত্যাদি হলেও সবই জল থেকেই তৈরি হয়, কিন্তু শরীর তাদের খাবার হিসেবেই জানে। অন্য কোনো পানীয় সাধারণ জলের জায়গা নিতে পারবে না। তাই সাধারণ ব্যাক্তিদের রোজ শুদ্ধ জল এক থেকে দেড় লিটার অবশ্যই খাওয়া উচিত।

● LMNT তে আমরা বলে থাকি যে joint pain সাধারণত রক্তে acid বেড়ে যাওয়ার কারনে হয়ে থাকে। তাই এইরকম লোকেদের টক জিনিস খাওয়া উচিত নয়।

কারণ – আয়ুর্বেদেও বলা হয় যে টক জিনিস খেলে ব্যাথা বাড়ে। তাই যাদের শরীরে ব্যাথা বা joint pain হয় তাদের টক জিনিস, যেমন – দই, তেঁতুল, টমেটো, লেবু ইত্যাদি খাওয়া উচিত নয়। একইভাবে যে ফল কাঁচা থাকার সময় টক হয় এবং পেকে গেলে মিষ্টি হয় – যেমন কলা,  পেঁপে, পেয়ারা, সবেদা, আতা, আঞ্জীর, আমলকী ইত্যাদিকে মাঝে মাঝে খাওয়া যেতে পারে। Naturopathy তে ট্রিটমেন্টে উপবাসের পর লেবুর শরবত খেতে বলা হয়। যদি কেউ উপবাস না করেন এবং খাবারের সাথে লেবু খান তাহলে ব্যাথা বাড়তে পারে। সাধারণত বলা হয় যে কোকোম acidity এর জন্যে খুব উপকারি। কিন্তু রোগীদের নিজেদের দেখে নেওয়া উচিত যে  খেলে joint pain হচ্ছে নাকি। প্রত্যেকের উপর সবরকম জিনিষের প্রভাব একইরকম হবে এটা নয়। এটা অনুভূতির ব্যাপার।

● আমাদের seasonal ফল এবং সবজি খাওয়া উচিত – যেটা সেই জায়গাতেই হয়।

কারণ – সময় এবং জায়গার সাথে সাথে আমাদের শরীরে লিভারের কেমিক্যালগুলি বদলাতে থাকে এবং seasonal এবং ওই জায়গার জিনিসগুলিকে হজম করতেই তৈরি হয়। তাই অন্য জায়াগার এবং অন্য season এর ফলকে হজম করতে সমস্যা হয়। যেমন এপ্রিল মাসের গরমে আম হয় – এটা ওই জায়গাতে এবং ওই season এ যারা থাকে তাদের জন্যে খুবই উপকারি। আর যদি ডিসেম্বর মাসে কেউ আম খায় তাহলে তার অবশ্যই অসুখ হবে। ওই মাসে খুবই ঠাণ্ডা থাকে, তাই ওই সময়ে মাল্টা জাতীয় ঠাণ্ডা সময়ের ফলই খাওয়া উচিত।

● তরমুজ জাতীয় ফল খাওয়ার পর জল খাওয়া চলবে না।

কারণ – এই ফল গরমকালে হয় – ঈশ্বর এটাতে আগে থেকেই বেশী মাত্রায় জল ভরে রেখেছেন যাতে মানুষের তেষ্টা মিটতে পারে। এরপর পরে জল খেলে শরীরের alkali বেড়ে যাবে, যার থেকে পেটে ব্যাথা বা জ্বর ও হতে পারে। এছাড়াও এইরকম ফল খাবার সাথে সাথেই জল খেলে loose motions ও হতে পারে। যাদের fits আসে তাদের এই জাতীয় ফল খেলে fits বাড়বে।

● জল সবসময় বসেই খাওয়া উচিত। না হলে calf muscles এ ব্যাথা হতে পারে।

কারণ – যখন আমরা কিছু খাই বা পান করি, তখন রক্তের প্রবাহ পেটের দিকে বেশী হবার কারণে পায়ের দিকে কম হয়। তাই মাংস-পেশি দুর্বল হয়ে যাবার কারণে ব্যাথা শুরু হয়।

● আমাদের সাধারণ জল এবং কুঁজোর জলই খাওয়া উচিত। ফ্রিজের জল শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক। কারণ ওই ঠাণ্ডা জলকে গরম করে শরীরের তাপমাত্রায় আনবার জন্যে রক্তকে বেশী কাজ করতে হয়। যার ফলে energy খরচ করতে হয়, যা শরীরের জন্যে বেকার কাজ।

● ঘুম থেকে উঠে সাথে সাথেই ঠাণ্ডা জল খেলে কিছু লোকের কফ আসে বা নাক দিয়ে জল পরে ইত্যাদি হতে পারে। হালকা গরম জল খাওয়া যেতে পারে। অথবা ওঠার ৫ মিনিট পর সাধারণ জল বা কুঁজোর জল খাওয়া যেতে পারে।

● Loose motions হলে সাধারণ জল খাওয়া উচিত নয়, না হলে সেটা আরও বেড়ে যাবে। Loose motions এ শরীর যাতে দুর্বল না হয়ে পরে তার জন্যে জলে লেবুর রস, বেশিমাত্রায় চিনি এবং নুন মিশিয়ে অল্প অল্প করে মাঝে মাঝে খেতে হবে। শুধু নুন দেওয়া জল খেলে loose motions বাড়তে পারে।

● যে জলে bubbles দেখা যাবে সেটাকে না খাওয়াই উচিত। এইধরনের জল পেটে যাওয়ার পরে সমস্যা সৃষ্টি করবে যা শরীরের জন্যে ক্ষতিকারক হবে।

কারণ – কিছুক্ষন রাখার পরে bubbles দেখা যাওয়ার মানে হল জলে bacteria আছে, যা শ্বসন প্রক্রিয়ার কারণে carbon dioxide বের করছে। শহরের জলে bubbles আসার একটা প্রধান কারণ হল যে, খাওয়ার জলের পাইপে কোন কারনে  এর নোংরা জলের মিশে যাওয়া। এই জীবাণুগুলির কারনে কলেরা, টাইফয়েড ইত্যাদি অসুখ হতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *